সূরা আল-জিন এর বাংলা অনুবাদ, শানে নূজুল ও ব্যাখ্যা
সূরা আল-জিন কুরআনের ৭২তম সূরা। এটি মক্কী সূরা, যা মক্কায় নাযিল হয়েছিল এবং এর মোট ২৮টি আয়াত রয়েছে। সূরাটি মূলত জিন এবং তাদের সম্পর্কিত বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করে। এই সূরাটি কুরআনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূরা, যা জিনের স্বভাব, তাদের বিশ্বাস, আল্লাহর সাথে সম্পর্ক, এবং মানুষের সাথে তাদের সম্পর্কের ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করে।
সূরা আল-জিন (আরবি):
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ
1. قُلْ أُوحِيَ إِلَيَّ أَنَّهُ اسْتَمَعَ نَفَرٌ مِّنَ الْجِنِّ فَقَالُوا إِنَّا سَمِعْنَا قُرْآنًا عَجَبًا (১)
2. يَهْدِي إِلَى الرُّشْدِ فَآمَنَّا بِهِ وَلَا نُشْرِكُ بِرَبِّنَا أَحَدًا (২)
3. وَأَنَّهُ تَعَالَىٰ جَدُّ رَبِّنَا مَا اتَّخَذَ صَاحِبَةً وَلَا وَلَدًا (৩)
4. وَأَنَّهُ كَانَ يَقُولُ سَفِيهُنَا عَلَى اللَّهِ شَطَطًا (৪)
5. وَأَنَّا ظَنَنَّا أَنْ لَن تَقُولَ الْإِنسُ وَالْجِنُّ عَلَى اللَّهِ كَذِبًا (৫)
6. وَأَنَّهُ كَانَ رِجَالٌ مِّنَ الْجِنِّ يَعُوذُونَ بِرِجَالٍ مِّنَ الْإِنسِ فَزَادُوهُمْ رَهَقًا (৬)
7. وَأَنَّهُمْ ظَنُّوا كَمَا ظَنَنْتُمْ أَنْ لَنْ يَبْعَثَ اللَّهُ أَحَدًا (৭)
8. وَأَنَّا لَمَسْنَا السَّمَاءَ فَوَجَدْنَاهَا مُلِئَتْ حَرَسًا شَدِيدًا وَشُهُبًا (৮)
9. وَأَنَّا كُنَّا نَجْلِسُ مِنْهَا مَقَاعِدَ لِلسَّمْعِ فَمَن يَسْتَمِعِ الْآنَ يَجِدْ لَهُ شِهَابًا رَّصَدًا (৯)
10. وَأَنَّا لَا نَدْرِي أَشَرٌّ أُرِيدَ بِمَن فِي الْأَرْضِ أَمْ أَرَادَ بِهِمْ رَبُّهُمْ رَشَدًا (১০)
11. وَأَنَّا مِنَّا الصَّالِحُونَ وَمِنَّا دُونَ ذَٰلِكَ كُنَّا شِيعًا قِدَدًا (১১)
12. وَأَنَّا ظَنَنَّا أَنْ لَنْ نُعْجِزَ اللَّهَ فِي الْأَرْضِ وَلَنْ نُعْجِزَهُ هَرَبًا (১২)
13. وَأَنَّا لَمَّا سَمِعْنَا الْهُدَىٰ آمَنَّا بِهِ فَمَن يُؤْمِنْ بِرَبِّهِ فَلَا يَخَافُ بَخْسًا وَلَا رَهَقًا (১৩)
14. وَأَنَّا مِنَّا مُسْلِمُونَ وَمِنَّا قَاسِطُونَ فَمَنْ أَسْلَمَ فَأُو۟لَـٰٓئِكَ تَحَرَّوْا رَشَدًا (১৪)
15. وَأَمَّا قَاسِطُونَ فَكَانُوا لِجَهَنَّمَ حَطَبًا (১৫)
16. وَأَنْ لَوِ اسْتَقَامُوا عَلَى الطَّرِيقَةِ لَسَقَيْنَاهُمْ مَاءً غَدَقًا (১৬)
17. لِّنَفْتِنَهُمْ فِيهِ وَمَن يُعْرِضْ عَنْ ذِكْرِ رَبِّهِ يُسْلِكْهُ عَذَابًا صَعَدًا (১৭)
18. وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا (১৮)
19. وَأَنَّهُ لَمَّا قَامَ عَبْدُ اللَّهِ يَدْعُوهُ كَادُوا يَكُونُونَ عَلَيْهِ لِبَدًا (১৯)
20. قُلْ إِنَّمَا أَدْعُوا رَبِّي وَلَا أُشْرِكُ بِهِ أَحَدًا (٢٠)
21. قُلْ إِنِّي لَا أَمْلِكُ لَكُمْ ضَرًّا وَلَا رَشَدًا (٢١)
22. قُلْ إِنِّي لَنْ يُجِيرَنِي مِنَ اللَّهِ أَحَدٌ وَلَنْ أَجِدَ مِن دُونِهِ مُلْتَحَدًا (٢٢)
23. إِنِّي لَا أَمْلِكُ إِلَّا مَا يُوحَىٰ إِلَيَّ وَمَا أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ مُّبِينٌ (٢٣)
24. قُلْ لَا يَسْتَوِي الْأَعْمَى وَالْبَصِيرُ (٢٤)
25. وَلَا الظُّلُمَاتُ وَلَا النُّورُ (٢٥)
26. وَلَا الْجَاهِلُونَ وَالْعَارِفُونَ (٢٦)
27. إِنَّمَا تُدْرَكُونَ فِي بَطْنِ الْأَرْضِ إِلَّا كَمَا يَحْيَا النَّاسُ (٢٧)
28. وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَاءَتُهُ (٢٨)
বাংলা অনুবাদ:
১. বলো, আমার কাছে প্রেরিত হয়েছে যে, একটি দল জিন তাদের কানে কানে কুরআন শুনেছে এবং তারা বলেছে, “আমরা বিস্ময়কর কুরআন শুনেছি,
২. যা সৎপথে পরিচালিত করে, তাই আমরা এতে বিশ্বাস করেছি এবং আমরা আমাদের রবের সাথে কোনো কিছু শিরক করব না,
৩. আর তিনি (আল্লাহ) অত্যন্ত মহান, তিনি কোনো স্ত্রীর বা সন্তানের মালিক নন,
৪. এবং আমাদের ক্ষুদ্ররা আল্লাহ সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর কথা বলত,
৫. আর আমরা ধারণা করেছিলাম যে, মানব ও জিনেরা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা কথা বলবে না,
৬. এবং সত্য যে, পুরুষেরা জিনদের থেকে সাহায্য চাইতো, ফলে তাদের ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়ে যেত,
৭. এবং তারা বিশ্বাস করেছিল, যেমন আপনি বিশ্বাস করেন, যে আল্লাহ কাউকে পুনরায় জীবন দান করবেন না,
৮. এবং আমরা আকাশে উঠেছিলাম, এবং সেখানে প্রবল পাহারাদার এবং উল্কা পাথরের ব্যাপার ছিল,
৯. এবং আমরা আগে আকাশের কাছে বসে শুনতাম, কিন্তু এখন যে কেউ শুনতে চায়, তার জন্য তা আরও কঠিন হয়ে গেছে।
১০. আর আমরা জানি না, কি মানবজাতির জন্য কিছু খারাপ হওয়া চায়, অথবা তাদের রব তাদের জন্য সৎপথ চায়,
১১. আর আমরা সৎ এবং অসৎ জিনদের মধ্যে বিভক্ত।
১২. এবং আমরা বিশ্বাস করি, যে কেউ আল্লাহর পথে চলে, সে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি প্রাপ্ত হবে,
১৩. এবং আমরা বলেছি, যে জিনেরা সৎপথ অনুসরণ করবে তাদের জন্য বিশেষ পুরস্কার থাকবে।
শানে নূজুল (সূরার নাজিল হওয়ার প্রেক্ষাপট):
সূরা আল-জিনের শানে নূজুলে বলা হয়েছে, যখন হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কুরআন পড়ছিলেন, তখন কিছু জিন শ্রোতা হয়ে তাঁর কুরআন শোনে এবং তারা তা বিশ্বাস করে। তারা তা শোনার পর বলে, "এটা কোনো সাধারণ কথা নয়, এটি সত্যিই আল্লাহর বাণী, যা মানুষের জন্য হেদায়েত দান করে।" তারা আল্লাহর পথ অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং মানব জাতির জন্যও আল্লাহর পথে চলার আহ্বান জানান।
তাফসির ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা:
সূরা আল-জিনের মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে জিনদের প্রতি আল্লাহর আহ্বান এবং তাদের বিশ্বাসের পরিবর্তন, তাদের ভুল ধারণা ও কুরআনের প্রতি তাদের প্রতিক্রিয়া। এই সূরা আধ্যাত্মিকভাবে মানবজাতি ও জিনদের জন্য সতর্কীকরণ এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরে।
-
জিনের অবস্থান ও বিশেষত্ব: এই সূরা থেকে জানা যায় যে, জিনেরও চিন্তা-ভাবনা, মুক্ত ইচ্ছাশক্তি, বিশ্বাস ও অবাধ চলাচল রয়েছে। তারা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী হতে পারে, আবার শয়তানের পথও অনুসরণ করতে পারে।
-
ইসলামের শাস্তি এবং পুরস্কার: এই সূরায় আল্লাহ সতর্ক করেছেন যে, যারা তাঁর পথ অনুসরণ করবে তারা সৎপথে পরিচালিত হবে এবং যারা না করবে, তারা শাস্তি পাবে।
-
কুরআনের শক্তি: সূরাটি এও স্পষ্ট করে যে, কুরআন কেবল মানুষের জন্য নয়, জিনদের জন্যও পথ প্রদর্শক।
উপসংহার:
সূরা আল-জিন কুরআনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূরা যা জিনদের বিশ্বাস এবং তাদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশনা তুলে ধরে। এটি আমাদের জানিয়ে দেয় যে আল্লাহ তাআলা মানব ও জিন, উভয়ের জন্যই পথ নির্দেশ দিয়েছেন এবং যারা আল্লাহর পথে চলবে তারা সফল হবে। সূরাটি জিন এবং মানবের জন্য এক দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করে, যা মানুষের জন্য উপকারি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উপায় হিসেবে প্রমাণিত।
Comments
Post a Comment